নিমাই ভট্টাচার্য সাংবাদিক থেকে লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ‘মেমসাহেব’ উপন্যাসই লিখেই

ফারুক আহমেদ, প্রতিফলকঃ যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার বর্তমান জেলা শালিখা থানা এলাকার শরশুনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নিমাই ভট্টাচার্য। তিন বছর বয়সে তিনি মাতৃহীন হন। তাঁর পিতার নাম সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ১৯৪৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর তিনি কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

বাংলাদেশের বগুড়া জেলার কালীতলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কন্যা দীপ্তি ভট্টাচার্যকে বিবাহ করেন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী ভাবেই বসবাস করেন। কলকাতার টালিগঞ্জের শাশমল রোডের বাসায় বসবাস করতেন শেষ জীবন পর্যন্ত।

বিখ্যাত ও জনপ্রিয় উপন্যাস হচ্ছে ‘মেমসাহেব’। এই ‘মেমসাহেব’ উপন্যাস লিখেই নিমাই ভট্টাচার্য সাংবাদিক থেকে লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

বৃহস্পতিবার ২৫ জুন ২০২০ নিমাই ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা।

নিমাই ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৩১ সালে। নিমাই ভট্টাচার্য ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও তার আদিনিবাস সোনার বাংলাদেশের যশোরে। যশোরের সম্মিলনী ইন্সটিটিউশনে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। দুই বাংলার পাঠক মহলে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য।

১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় চলে আসেন কলকাতায়। পেশাগত জীবন শুরু হয় সাংবাদিকতা দিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস ছাপা হয় অমৃত পত্রিকায় ১৯৬৩ সালে। উপন্যাসটি পাঠকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়।

‘মেমসাহেব’ জনপ্রিয় উপন্যাস ১৯৬৮ সালে প্রকাশ পায়। এই উপন্যাসের জন্য পাঠক মহলে তাঁর বিশেষ পরিচিতি হয় এবং তার দ্রুত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হয়ে উঠতে লাগলেন। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৫৩ টিরও বেশি।

তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মেমসাহেব’ চলচ্চিত্র রূপ পায় ১৯৭২ সালে। তাতে কেন্দ্রীয় বাচ্চু চরিত্রে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার। এছাড়া আরও অভিনয় করেছিলেন মেমসাহেব হিসেবে অপর্ণা সেন। পরে তার আরও অনেক উপন্যাসের চিত্রায়ণ হয়েছে।

অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘রাজধানীর নেপথ্যে’ ছাপা হওয়ার পর লিখেছেন ‘রিপোর্টার’, ‘পার্লামেন্ট স্ট্রিট’, ‘ডিপ্লোম্যাট’, ‘মিনিবাস’, ‘মাতাল’, ‘ইনকিলাব’, ‘ব্যাচেলর’, ‘কেরানি’, ‘ডার্লিং’, ‘নাচনি’, ‘প্রিয়বরেষু’, ‘পিকাডিলী সার্কাস’, ‘কয়েদী’, ‘জংশন’, প্রবেশ নিষেধ, ‘ম্যাডাম’, ‘ককটেল’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’ ‘মৌ’ সহ বহু উপন্যাস।

মোশারফ হোসেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যকে নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন।

‘মেমসাহেব’-এর স্রষ্টা সেদিন বললেন, জোর ফেঁসে গেছিস। তাই তো?

জনপ্রিয় সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের প্রয়াণে গভীর বেদনা অনুভব করছি। তাঁর বেশ কিছু উপন্যাসই পাঠকমহলে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তবে অন্য সবগুলোকে ছাপিয়ে গেছে ‘মেমসাহেব’। হাজার হাজার বাঙালি তরুণ মেমসাহেব পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তাঁর প্রয়াণের খবর প্রচারিত হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়াতেও কেউ কেউ তা জানাচ্ছেন। কয়েকদিন আগে দিল্লিপ্রবাসী এক বাঙালি যুবকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হচ্ছিল। তিনি দিল্লিতে সাংবাদিকতা করেন। একসময় কলকাতায় ছিলেন। কথাপ্রসঙ্গে তিনিও জানালেন, সাংবাদিকতায় তাঁর আসাটা নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব পড়েই।

আমি নিজে মেমসাহেব পড়ি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র অবস্থায়। সবে ঊনিশে পা দিয়েছি। কলকাতায় এক পরিচিত সপ্তদশী তরুণী একদিন একটা কালো প্রচ্ছদওয়ালা বই হাতে দিয়ে বলল, এটা প’ড়ো, তোমার ভালো লাগবে। দেখলাম বইয়ের নাম মেমসাহেব। তখন টুকটাক কবিতা লিখি। একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় (শ্রদ্ধেয় পান্নালাল দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘কম্পাস’ পত্রিকা) মাঝেমধ্যে লেখা পাঠাই। ছাপা হয়। ভালো লাগে। তবে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেব, অতটা ভাবিনি। মেমসাহেব পড়ে মুগ্ধ হলাম। ভাবলাম এমনও হয়!

পরবর্তীকালে যখন সত্যি সত্যিই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিলাম, তখন মেমসাহেব উপন্যাসটির কথা বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলাম। সেসময় বর্তমান পত্রিকায় ট্রেনি জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করছি। পত্রিকার বিজ্ঞান বিষয়ক পাতার জন্য প্রখ্যাত বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মণীশ প্রধানের পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎকার নিতে একদিন বিকেলে তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়ি যাচ্ছি। হাতিবাগানের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম পাশেই একটি সিনেমা হলে ‘মেমসাহেব’ চলছে। মিনিট দশ-পনেরো বাদেই ইভিনিং শো। কী জানি কী হল, এমন একটা কাজ করে বসলাম যা আমার স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। ঝট করে বাস থেকে নেমে একটা বুথ থেকে ডাক্তারবাবুকে টেলিফোন করলাম। অনুরোধ, আজকের বদলে আগামীকাল আপনার বাড়িতে যাব। প্লিজ একটু সময় দেবেন। উনি রাজি হয়ে গেলেন। অতএব আমার চরণ দু’টি দ্রুত পৌঁছে গেল সিনেমা হলটির টিকিট কাউন্টারের সামনে।

তবে ঊনিশ বছর বয়সে মেমসাহেব পড়ে যে অনুভূতি হয়েছিল, পঁচিশ বছর বয়সে রুপালি পর্দায় মেমসাহেব দেখে তার শতকরা তিরিশ ভাগও হল না। কেন জানি না।

বেশ ক’বছর বাদে একদিন কলকাতা প্রেস ক্লাবের লনে বসে নিমাই ভট্টাচার্যকে তাঁর ওই উপন্যাস সম্পর্কে আমার দুই বয়সে দু’রকম মাধ্যমে দুই অনুভূতির কথা জানিয়েছিলাম। উনি কোনও মন্তব্য করেন নি। কেবল মিটি মিটি হেসেছিলেন। সেদিন ঝকঝকে চেহারার সুপুরুষ নিমাইদার সেই হাসি দেখে বললাম, কিছু বলছেন না যে! উনি আবার একইরকম হাসলেন।

নিমাইদা’র অনেক স্মৃতিই এই মুহূর্তে মনের পর্দায় ভিড় করছে। পর পর বেশ কয়েক বছর কলকাতা প্রেস ক্লাবের পরিচালন কমিটিতে থাকার সুবাদে প্রায়ই ক্লাবে যেতাম। ওইসময় নিমাইদাকে সপ্তাহে তিন-চারদিনই ক্লাবে দেখতাম। লনে বসে পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। মাঝে মাঝেই কথাবার্তা হত। নিমাইদা প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে।

সেটা সম্ভবত ১৯৯৪ সাল। তখন সল্ট লেকের একটি আবাসনে থাকতাম। ওই আবাসনে বেশ ধূমধাম করে জগদ্ধাত্রী পুজো হত। পুজোর বেশ কিছুদিন আগেই উদ্যোক্তাদের একজন বললেন, দাদা এবারে আমাদের পুজো উদ্বোধনের ব্যাপারটা বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে করতে চাই। আপনাকে একটু সাহায্য করতে হবে। কী সাহায্য? জানালেন, উদ্বোধনের মঞ্চে বিভিন্ন ক্ষেত্রের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আমরা একটু সম্মান জানাব, তাঁদের বক্তব্য শুনব। আপনি যদি কোনও একজন নামী সাংবাদিক বা সাহিত্যিককে আনার ব্যবস্থা করে দেন খুবই উপকৃত হব। পরদিন আমি এক প্রবীণ সাংবাদিকের বিষয়টি বললাম। উনি যথেষ্ট নামী মানুষ। আমার প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন।

অনুষ্ঠানের দিনকয়েক আগে উদ্যোক্তাদের কয়েকজন আমার বাড়িতে হাজির। বেশ উত্তেজিত। কী ব্যাপার? বললেন, দাদা আপনি কাকে ঠিক করে দিয়েছেন! উনি তো অদ্ভুত মানুষ! আগে ফোনে কথা হয়েছিল। পরে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র দিতে গতকালই ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। উনি জানতে চাইলেন, আর কে কে আসবেন। নামগুলো শুনে বললেন, আমি যাব না। কারণ, যেখানে ফিল্মের লোকজন থাকে সেখানে অন্যদের কেউ পাত্তা দেয় না। বিশেষ করে যে উঠতি তারকা আসবে বলছেন, ওকে নিয়েই সবাই মাতামাতি করবে। আমার দিকে কেউ তাকিয়েও দেখবে না।

শুনে তো আমার মাথায় হাত। প্রেস্টিজ পাংচার হওয়ার জোগাড়! বললাম, আচ্ছা দেখছি কী করা যায়। ওরা বললেন, দাদা, আর তো মোটে তিনদিন বাকি!

আমার কপাল ভালো। সেদিন বিকেলে প্রেস ক্লাবে নিমাইদা’র সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভাবলাম, একবার বলে দেখি। যদি রাজি হন। সত্যি কথাটা সরাসরি বলতে কেমন বাধল। যদি অসম্মানিত বোধ করেন! বলে বসেন, আমায় ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো পেয়েছিস বুঝি! তাই বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আসলে ওরা বেশ কয়েকদিন আগেই আমাকে আপনার কথা বলেছিল। আমারই বলা হয়ে ওঠেনি।

নিমাইদা একঝলক আমার দিকে দেখলেন। তারপর আমার ডান হাতটা খপ করে ধরে হাসতে হাসতে বললেন, দ্যাখ মোশারফ, আমার বয়স অনেক হল। তোর কেসটা ভালোই বুঝছি। লাস্ট মোমেন্টে কেউ বেঁকে বসেছে। আর কাউকে ম্যানেজ করতে পারিস নি। ফলে জোর ফেঁসে গেছিস। তাই তো?

আমি হেসে ফেললাম। মাথা নেড়ে জানালাম, ঠিক তাই।

বললেন, ঠিক আছে। আমি যাব। ওইদিন বিকেলে ঠিক পাঁচটায় এখানেই গাড়ি পাঠাতে বলিস। আর, তুই কিন্তু ওখানে থাকবি।

নিমাইদা কথা রেখেছিলেন। তবে একটু দেরিতেই পৌঁছেছিলেন। সেটা অবশ্য তাঁর দোষে নয়। তাঁকে আনতে পাঠানো গাড়িতে যান্ত্রিক বিভ্রাটের কারণেই বোধহয়।

পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। চলচ্চিত্র তারকা নিয়ে হইচই হয়েছিল ঠিকই তবে মেমসাহেবে’র স্রষ্টা সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যও সেদিন দর্শকদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিলেন। বিশেষত মহিলাদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো সাড়া পড়েছিল। অনেকেই ঘিরে ধরেছিলেন। বেশ কয়েকজন অটোগ্রাফের খাতা এগিয়ে দিয়েছিলেন। উনি হাসিমুখে সই করে দিচ্ছিলেন।

ফেরার সময় বললেন, আজকের সন্ধ্যাটা মন্দ কাটল না! কী বলিস!

আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, আপনি আমায় বাঁচিয়ে দিলেন।

WhatsApp chat
error: